Tag Archives: গণপিটুনি

দেশাত্মবোধ বাংলা

গণপিটুনির সৃজনশীল প্রতিকার

রাজন মারা গেছে। যে এলাকাবাসী তাঁকে মার খেতে দেখে বাধা দেয়নি, সেই ভণ্ড এলাকাবাসী-ই রাজনের হত্যাকারীদের ধরতে পুলিশকে সময় বেধে দিয়েছে। গণধোলাইয়ের এই সংস্কৃতি অবশ্য সিলেটের কুমারগাঁওয়ের-ই শুধু নয়, এ সংস্কৃতির বীজ বাংলার অলিতে-গলিতে।

গণপিটুনি/গণধোলাই বাংলাদেশের একটি কুৎসিত সংস্কৃতি। দেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের হলেও জাতির মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রেই যে নিম্ন থেকেও নিম্নতর তার অনেকগুলো প্রমাণের এটি একটি।

কথা হচ্ছে এটি কিভাবে বন্ধ করা সম্ভব? বাঙালিমাত্রই জানে যে তাকে সাধুকথা শুনিয়ে ঠিক করা বাতুলতা মাত্র। তবে কঠোর বাস্তবতা বাঙালিকে সবসময়ই সোজা করতে ও রাখতে কাজে দিয়েছে।

গণধোলাইয়ে সমস্যা হচ্ছে প্রায় সময়ই কে যে মারপিট করেছে বা করেনি বা শুরু করেছে কি করেনি তার রেকর্ড পাওয়া মুশকিল, তাই সঠিক কাউকে সাজা দেওয়া সম্ভব হয় না প্রায় সময়-ই। আর পুলিশ অজ্ঞাত হাজারখানেক আসামী করলেও হাজারখানেক লোককে হাজতে ভরতে পারবে না। মাঝে মাঝে পুলিশ নিজেও এটি একটি সমাধান মনে করে নির্বিকার থেকে এটিকে প্রশ্রয় দেয়। তবে এটা যেহেতু প্রকাশ্যে হয় তাই দায়িত্ব অবশ্যই এলাকাবাসীর ওপর বর্তায় ও বর্তানো উচিত। সুবিধাবাদীরা এখানে পুলিশের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পারে কিন্তু এলাকাবাসীর মানসিকতা উন্নয়নের স্বার্থে এই দায়িত্ব তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। কারণ যারা খালি হাতে বা লাঠি দিয়ে পেটাতে পারে, তারা খালি হাতে বা লাঠি দিয়ে পেটানো বন্ধও করতে পারে। সহজ যুক্তি।

এবার আসি সাজা প্রসঙ্গে। একজনকে সাজা না দিয়ে আমি এখানে কঠোরহাতে এলাকাবাসীর ওপর শাস্তি প্রয়োগ করার পক্ষে। কারণ রাজন হত্যাকাণ্ডে পুলিশ মুহিত আলমকে পিটিয়ে মারলেও এলাকাবাসীর মানসিকতা তাতে পরিবর্তন হবে না। তাই সিলেটের কুমারগাঁও এলাকা ধরেই কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে যেহেতু তাদের অঞ্চলে প্রকাশ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটলেও তারা তাতে বাধা দেয়নি বা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন শাস্তিটা কি হবে? অনেক আইডিয়া আছে আমার কাছে।

০১. নির্দিষ্ট স্থাপনা ব্যতীত এলাকার সকল স্থানে দৃষ্টান্তমূলক লোডশেডিং। বিদ্যুত থাকুক বা না থাকুক, গরম বেশি পড়লে বেশি বেশি লোডশেডিং। ভোল্টেজও কমিয়ে রাখা হবে যেনো ফ্যান তিরতির করে ঘুরে। লোকজনের যেহেতু পিটাপিটির স্বভাব আছে, তাই তারা বিদ্যুত অফিস ভাঙচুর করতে পারে। নো প্রবলেম। চাঁদা তুলে বা গতর খেটে ঠিক করে দেবে নইলে কোনো বিদ্যুত-ই নাই।

০২. কঠিন বৃষ্টি হলেই পয়‍ঃনিষ্কাশন বন্ধ। কঠিন ময়লা পানি রোদে-বাতাসে না শুকানো পর্যন্ত পা ডুবায় হাঁটতে থাকবে। পৌরসভা ভাংচুর করতে আসলে ময়লা পানিতে পা ভিজায়ে আসবে। ভাংচুরের পর বাসায় গিয়ে পা চুলকাবে আর ক্রিম ঘষবে। চুলকালে বিশাল আরাম হয়।

০৩. দেশে এলাকাভিত্তিক মানসিকতার শ্রেণীবিন্যাস করা হবে। এই শ্রেণীর নিচের দিকের এলাকায় বাজেটের অবকাঠামো উন্নয়নের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হবে। টাকা বড় ইস্যু।

০৪. সাপ্লাইয়ের পানির ব্যবস্থা থাকলে সেটির কৃত্রিম আকাল তৈরি করা হবে। পর্যাপ্ত পানির জন্য ট্যাংকের কাছে লাইন দিতে হবে অথবা নগদ টাকা দিয়ে পর্যাপ্ত মূল্যে গাড়িভর্তি পানি কিনে নিয়ে যেতে হবে। কতো ধানে কতো চাল গো?

০৫. রান্নাবান্নায় গ্যাস ব্যবহার হলে (সিলেটের ঘরে ঘরে যেহেতু গ্যাস তাই এ পদ্ধতি সেখানে কাজে দেবে) গ্যাসের চাপ পিক আওয়ারে কমিয় রাখা যায়। শাস্তি হিসেবে তাই এলাকাবাসী তখন থেকে অফপিক আওয়ারে খাবে আর পিক আওয়ারে বাথরুম করবে।

০৬. এলাকাসুদ্ধ জরিমানা করা হবে এবং এই জরিমানার টাকা আদায়ের জন্য বিভিন্ন লোকাল ট্যাক্স (যেগুলো পণ্যমূল্য বাড়ায় না বরং বাড়ি/দোকান ভাড়া বা ইউটিলিটি বিল বাড়ায় সেগুলো) বাড়ায় দেওয়া হবে। দোকানের জিনিসের দাম ব্যবসা বাঁচানোর জন্যই বাড়াবে না কারণ নইলে লোকে পাশের এলাকা থেকে জিনিস কিনবে যে!

০৭. পুলিশ এসব ক্ষেত্রে কোনোভাবেই দায়িত্ব এড়াতে পারে না। কর্মরত পুলিশ খবর পেলে ও ব্যবস্থা না ঐ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু চাকরি গেলেই চলবে না, অবহেলার মাত্রা বুঝে পেনশন ও অন্যান্য সুবিধাও ঝুলায় দেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে পুলিশের বিশেষ হটলাইন থাকবে যেখানে রেকর্ড থাকবে সত্যি-ই কেউ পুলিশকে অবহিত করেছিলো কী না।

০৮. পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন ঐ এলাকার ময়লা-আবর্জনা প্রতিদিন পরিস্কার করবে না, বরং ময়লা পঁচে যখন এক-দুই দিন ধরে সুবাস পাবে তারপর নিবে। রাস্তায় কুকুর-বিড়াল মরলে বা হাগু করলে সেটা নিজেরা পরিস্কার করবে নইলে সুবাস নিতে থাকবে। নিজের এলাকার মশা-মাছিও নিজে তাড়াবে। পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের কিচ্ছু করার নাই।

০৯. আইন-শৃঙ্খলা বেশি খারাপ হলে আর্মি/বিজিবি তো আছেই। বাংলার মানুষজন আবার মিলিটারির গুলির চেয়ে মাইর বেশি ভয় পায়। মিলিটারির মাইরের এই ভীতি কাজে লাগানো সম্ভব। এমন এলাকার লোকজন কাওয়ার্ড হওয়াটা স্বাভাবিক, তাই মাইর খেলে দেখা যাবে লেজ না গুটিয়ে বরং ফেলে রেখেই দৌড় দিয়েছে।

১০. গণধোলাইয়ের আয়োজক বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর জন্য কোনো ছাড় নাই। এলাকাবাসী ধরায় দিতে পারলে ও পিটুনি কার্যক্রম বন্ধ করতে পারলে এলাকাবাসীর শ্রেণীমান ওপরে ওঠার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের পুরষ্কৃতও করা হবে।

এভাবে আরও অনেক পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব, তবে মাথায় এই মুহুর্তে এ-কটাই আসলো। ঘটনা ঘটার সাথে সাথে প্রথমে দ্রুততম সময়ে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে এমন পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করে পরে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলে এমন পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা উচিত। শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের মানুষদের কষ্ট যেনো একটু সহনীয় পর্যায়ে থাকে সেটি দেখা দরকার তবে বেশি দেখার দরকার নাই। তরুণ ছাত্ররাই পকেটমার পিটায় আবার এরাই বাধা দেয়। পিটুনিদাতার ছেলে-মেয়েও স্কুলে যায়। যার বাপ-ভাই এমন, তাকে তো কষ্ট একটু করতেই হবে। দ্রব্যমূল্য ও সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা দরকার যে-কোনো মূল্যে। মূলকথা হলো এলাকাবাসীকে সুন্দরভাবে এলাকায় রেখে সাইলেন্ট মাইর দিতে হবে। গণপিটুনির জন্য চাই শাস্তির গণপ্রয়োগ।

গণধোলাইরোধ ছাড়াও সংষ্কৃতির আরও অন্যান্য কুৎসিত দিক দূরীকরণে এসব পদ্ধতি কাজে লাগানো যেতে পারে। চাপ প্রয়োগ করে একটা প্রজন্ম ঠিক করতে পারলে পরের প্রজন্মগুলো দেখেই সভ্যতা শিখবে, চাপের আর দরকার হবে না।

তবে এসব শাস্তি প্রয়োগের সময় হাইকুট যেনো আবার রিট-রুট দিয়ে হাইকুট দেখাতে না আসে সেটি সরকারের লক্ষ্য করা দরকার। বিচারপতিরা আবার বিরাট আনপ্রেডিক্টেবল ক্রিয়েচার। তথাকথিত সুশীলরা যেহেতু শুধু কথা বলে তাই তাদেরকে পাত্তা না দিলেও চলবে। আর এই পদ্ধতি সার্বিকভাবে প্রয়োগ হওয়া দরকার। যেমন: ডাকাত গণপিটুনিতে মরলেও ছাড় দেওয়া উচিত হবে না, কারণ আমরা মানসিকতা পরিবর্তন করতে চাচ্ছি তাই গণপিটুনি জিনিসটা না ভোলার আগ পর্যন্ত তাই আমরা তাদের বিভিন্নভাবে চাপে রাখবো। পাশাপাশি চলবে সুকথা ও সুশিক্ষার প্রচার সভ্যতার পথে এসো।

পরিশেষে, রাজন আমি অমন নই মোটেও, তবুও ক্ষমাপ্রার্থী।